যে শহরের সুযোগ-সুবিধা ও পরিকাঠামো সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৭৫ লাখ অধিবাসীর উপযোগী, সেই রাজধানী ঢাকা এখন বয়ে বেড়াচ্ছে ৩ কোটি ৬৬ লাখেরও বেশি মানুষের বিশাল ভার। অতিরিক্ত এই জনসংখ্যার চাপে নগরীর নাগরিক সেবা খাতগুলো ইতোমধ্যে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। একজন নাগরিকের বরাদ্দকৃত মৌলিক সুবিধা ভাগ করে নিতে হচ্ছে কয়েকজনকে, ফলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে চরম বেকায়দায়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা যায়, আয়তন ও ঘনবসতির বিচারে ঢাকা বিশ্বের মেগাসিটিগুলোর শীর্ষ সারিতে থাকলেও বাসযোগ্যতার বিচারে এর অবস্থান তলানিতে। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) চলতি বছরের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। বাসযোগ্যতায় ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিদ্ধস্ত ত্রিপোলি ও দামেস্ক। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিত এই জনস্রোত অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাসযোগ্যতার সর্বনিম্ন মানদণ্ডটুকুও হারাবে এই মহানগরী।
জনঘনত্বের চরম বাস্তবতা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র এক শতাংশ জুড়ে ঢাকা মহানগরের অবস্থান। ১৯৭১ সালে এই নগরের জনসংখ্যা ছিল ১৮ লাখ, যা ২০০০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৪ লাখে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের (ইকোসক) ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ বিজ্ঞপ্তির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার অধিবাসী সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ।
জাতিসংঘের আবাসন কর্মসূচির (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি একরে ৬০ জন (সর্বোচ্চ ১২০ জন) বাস করা উচিত। অথচ ঢাকায় প্রতি একরে বর্তমানে বাস করছেন গড়ে প্রায় ৮০০ মানুষ—যা বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি। এছাড়া প্রতিদিন কাজের খোঁজে কিংবা বাস্তুচ্যুত হয়ে গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার নতুন মানুষ এ শহরে স্থায়ীভাবে যুক্ত হচ্ছেন।
কষ্টের কারণ ও অনিয়ন্ত্রিত স্থানান্তর
কেন থামছে না ঢাকামুখী এই প্রব্রজন? নগরবিদ, পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও শিল্পায়ন এবং গ্রামে কাজের অভাবই এর প্রধান কারণ।
পরিবেশ ও বাস্তুচ্যুতির ধাক্কা: জলবায়ুর পরিবর্তন ও নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ৭৫ হাজার মানুষ ভিটামাটি হারাচ্ছেন। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে তারা রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন।
সেবা ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু: অধিকাংশ নামিদামি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক দপ্তর এবং চাকরির বাজার ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় জেলা শহরের মানুষও রাজধানীমুখী হতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিকল্প ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
বুয়েটের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম জানান, করোনা পরবর্তীতে ঢাকায় ফের জনস্রোত ত্বরান্বিত হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করা, বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং ঢাকা ছাড়াও বিকল্প অর্থনৈতিক হাব গড়ে না তুললে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা ৫ কোটি ২১ লাখে গিয়ে পৌঁছাতে পারে—যা নগরটিকে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল কিন্তু অকার্যকর মেগাসিটিতে পরিণত করবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক মনে করেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ালে ঢাকা অভিমুখে মানুষের ধেয়ে আসা রোধ করা সম্ভব।
এদিকে নাগরিক সুবিধার চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যার বিপরীতে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে এবং সেবা বৃদ্ধিতে জনবল কাঠামোর সংস্কারের উদ্যোগ চলছে। রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম জানান, ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।