‘কুইনিন জ্বর সারাবে বটে, কিন্তু কুইনিন সারাবে কে? বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তার ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থে কৌতুক করে একথা বলেছেন। আরও বলেন, সেকালে কুইনিন (কুইনাইন) দিয়ে দ্রুত ম্যালেরিয়া হতে নিরাময় লাভ যেত, কিন্তু কুইনাইন এমনই তিক্ততায় ভরা যে, ম্যালেরিয়া ভালো হলেও কুইনাইনের তিতার কারণে রোগীর অবস্থা যারপরনাই কাহিল হয়ে যেত।
ঠিক তেমনি মোবাইল ফোন বর্তমান সময়ে অপরিহার্য ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র, অনেকটা শরীরের অঙ্গের মতো দরকারি হয়ে গেছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন ছাড়া জীবন যাপন কল্পনাও করা যায় না। জীবনকে সহজ করে দিলেও কুইনিনের তিক্ততার মতোই শিশুসহ তরুণ-তরুণীরা এমন আসক্ত হয়ে পড়েছে যে, তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যাহত হচ্ছে। মোবাইল আসক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে লেখা-পড়া, ঘুম ও সময়ের কথা ভুলে যায়। তারা সারাক্ষণ স্মার্ট ফোন নিয়ে পড়ে থাকছে। দেখা দিয়েছে অনেকের চোখের সমস্যা। ভেঙে পড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন।
ক্ষুদ্র এ যন্ত্রটি দেশ-বিদেশের যে কোনো জায়গা থেকে সব ধরনের যোগাযোগ এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। অনেকটা কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সংকল্প’ কবিতার মতোই, ‘পাতাল ফেড়ে নামব নিচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে/বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে থেকে যে কাউকে সামনে দৃশ্যমান করতে পারে মোবাইল ফোন। কথাবর্তা, লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগ, ভার্চুয়াল মিটিং, শলা-পরামর্শ সবই সম্ভব করে দিয়েছে। স্মার্ট মোবাইল ফোন আজ বিনোদনের মাধ্যমও। রেডিও টর্চ লাইট, ক্যামেরা, ক্যালকুলেটর, টিভি, পত্রিকা, ভিসিডি, সিনেমা হল, ল্যাপটপ, আয়না, ঘড়ি, এলার্ম- এ সবই এখন এক স্মার্ট ফোনেই পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু বর্তমানে শিশু থেকে বয়স্ক, প্রায় সবার কাছেই মোবাইল ফোন। সুবিধার পাশাপাশি হাতের মুঠোয় থাকা এ যন্ত্রটি অনেকটা নেশায় পরিণত হয়েছে। শিশু কিশোররা এতটাই প্রভাবিত যে, তাদের কাছে বড়দের কথা কোনো গুরুত্বই পাচ্ছে না। এটা মেনে নিতে পারছেন না বয়স্করাও। এ ব্যাপারে কাজিপুর উপজেলা মাইজবাড়ি গ্রামের বয়োবৃদ্ধা হালিমা বেগম (৮৭) বলেন, আগের যুগে মোবাইল ছিল না। কষ্ট হলেও কোনো কাজই আটকে থাকতো না। কিন্তু আধুনিক যুগে মোবাইল অনেক ক্ষেত্রেই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে মোবাইল টিপতে শুরু করে। তারা স্কুল-কলেজের উদ্দ্যেশে বাড়ি থেকে বের হলেও সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে মোবাইল ফোনে। নিত্য নতুন সহপাঠী বন্ধু বা প্রেমিক/প্রেমিকা জুটিয়ে নেয়। শুরু হয় প্রেমালাপ। অনেক সময় ক্লাস তো দূরের কথা, সময় মতো বাড়িও ফেরে না।
সিরাজগঞ্জ কামারখন্দ উপজেলা ধলেশ্বর গ্রামের বয়োবৃদ্ধা মাজেদা বেওয়া (৮৬) ভাষায় ‘কী যে বারাইছে বুচুর বুচুর টেপা, কোনকার মানুষ কোনে কতা কয় বুজবারি পারি না। আবার হুনি এইটা দিয়া কতা কয়া কয়া ছেরার বাড়ি বিয়ার দাবিতে অনশন করে ছেরিরা। (কি বের হয়েছে বুঝতে পারি না। আবার শুনি মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলে ছেলের বাড়িতে বিয়ের দাবিতে অনশন করে মেয়েরা)।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বারাকান্দি মহল্লার প্রফেসর রেজাউল করিম জানান, মোবাইল ফোন আধুনিক যুগে সব মানুষের দরকার। কিন্তু এ ফোন আজ বহু জীবন ও সংসার ধ্বংস করে ফেলছে। তাছাড়াও তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্য সমস্যা, হেড ফোনে গান শুনতে শুনতে বা কথা বলতে বলতে রাস্তা পারাপারে দুর্ঘটনা ঘটার খবরও আসছে পত্রিকায়। নষ্ট হচ্ছে কাজের সময়। নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা ব্যাহত হচ্ছে। কাজে মন না বসা, পড়াশোনায় মন না বসার সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মোবাইল আসক্তির জন্য ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ। এতে কিশোরদের মধ্যে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। জানা যায়, মোবাইল ফোনের ব্যবহার আজ শহর, নগর থেকে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-গ্রামান্তরে।
এব্যাপারে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতাল পরিচালক ডাঃ আকিকুন নাহার, মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে ডাঃ জাহিদ ও সিরাজগঞ্জ শহরের বেসরকারি হাসপাতাল মেডিনোভার পরিচালক ডা. আকরামুজ্জামান ও আভিসিনা হাসপাতালে বিজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, মোবাইল ফোন অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা ছাড়াও শিশুদের চোখের সমস্যা বাড়ছে। তাছাড়াও মোবাইল ফোন ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের মেজাজ অনেকটাই খিটখিটে হয়ে যায়।
পারিবারিক অচেতনার কারণেই মোবাইল ফোনে পাবজি, ফ্রি ফায়ার, লুডু, জান্ডিমুন্ডা, তিন পাত্তি, ফোর্টনাইড সহ বিভিন্ন গেমে আসক্তি বাড়ছে। এসব গেমসহ ইউটিউবে অশালীন ভিডিও বন্ধ করলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে বলে সচেতন মহল মনে করেন।