
রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে তিনি পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠান হয়।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা বন্ধ করা, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৮০-এর দশকেও কয়েক দফায় বড় আকারে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলেও ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়।
তিনি বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো সেখান থেকে মানুষ পালিয়ে আসছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি প্রজন্ম। রোহিঙ্গা মায়েরা সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা নিজেদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামের স্মৃতি নিয়ে নিজভূমিতে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিবিরগুলোর পরিবেশ উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এসব স্থান দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য আদর্শ নয়। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার ও মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশ একাই রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করবে, সেটিও প্রত্যাশিত নয়। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও ‘আরাকান আর্মি’—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা দেখানোর সময় নয়; সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির স্থায়ী অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রথম দিনেই ১০ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী
বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রথম দিনেই ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে ১০টিতে সরাসরি অংশ নেন তিনি। দিনের কর্মসূচিতে ছিল বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক, জাতিসংঘের বিভিন্ন আয়োজন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বৈঠক।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দিনের কর্মসূচিকে সরকারের ‘৩৬০ ডিগ্রি’ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা আরও উচ্চতায় নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
প্রথম দিন জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ প্রাতরাশে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও তাদের সহধর্মিণীরাও এতে উপস্থিত ছিলেন। দিনের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও সস্ত্রীক অংশ নেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী প্লেনারি অধিবেশনেও যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। মাহদী আমিন এটিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একই পরিবারের তিন সদস্যের এভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনা বিরল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মাহদী আমিন আরও বলেন, এবারের ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করছেন। একই পরিবারের তিন সদস্যের বিশ্বমঞ্চে দেশের নেতৃত্ব দেওয়া এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধি দিয়ে অধিবেশন পরিচালিত হওয়ার বিষয়টিকে তিনি ইতিহাসের অনন্য নজির হিসেবে তুলে ধরেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতায় জোর
সফরের প্রথম দিনেই ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তারেক রহমান। এসব বৈঠকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানো, পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আলোচনায় আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা এবং হাইতির সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আগ্রহও বৈঠকে প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। মাহদী আমিনের ভাষায়, বৈঠকটি ছিল ‘গঠনমূলক, আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ’। নির্বাচনে বিজয় এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সফল উপস্থিতির জন্য তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এরদোয়ান। একই সঙ্গে তাকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি। দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গা সংকটেও কূটনৈতিক তৎপরতা
প্রথম দিনেই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে এবং অন্যটি জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার-বিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে।
বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফেরানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অতীতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় আসে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
আগামীকাল বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, ডিরেগুলেশন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা আরও বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে দুই পক্ষের অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়।
সময়স্বল্পতার কারণে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ও মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে নির্ধারিত দুটি বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। তবে মেটার সঙ্গে তার মনোনীত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মেটা ব্যবহারকারীকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশন নিয়ে আলোচনা হয়।
চার দিনের সরকারি সফরের শুরুতেই কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, উন্নয়ন অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি—বহুমুখী বিষয়ে সক্রিয় থাকলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম দিনের কর্মসূচিগুলোতে সরকারের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যই গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে তিনি পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠান হয়।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা বন্ধ করা, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৮০-এর দশকেও কয়েক দফায় বড় আকারে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলেও ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়।
তিনি বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো সেখান থেকে মানুষ পালিয়ে আসছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি প্রজন্ম। রোহিঙ্গা মায়েরা সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা নিজেদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামের স্মৃতি নিয়ে নিজভূমিতে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিবিরগুলোর পরিবেশ উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এসব স্থান দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য আদর্শ নয়। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার ও মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশ একাই রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করবে, সেটিও প্রত্যাশিত নয়। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও ‘আরাকান আর্মি’—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা দেখানোর সময় নয়; সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির স্থায়ী অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
Designed & Developed by: Security World



















