
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রাভিযান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি ঘিরে বাব আল–মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথটির ওপর চাপ বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক তেলবাজারে।
এর আগে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ পরিচালনা করেছিল। ইয়েমেনে আট শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েও ওয়াশিংটন গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি। বরং যুদ্ধের একপর্যায়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। এ ঘটনাকে বিশ্লেষকেরা মার্কিন সামরিক কৌশলের সীমাবদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
হুতি কারা
হুতি ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে তাদের উত্থান হলেও আন্তর্জাতিকভাবে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ২০১৪ সালে। ওই বছর তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বু মনসুর হাদিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পাওয়া সেই সামরিক অভিযান দীর্ঘদিন চললেও হুতিদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। পরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আবার বদলে দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করলে হুতিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লোহিত সাগরে ইসরায়েল–সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা শুরু করে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল–মানদেব
বাব আল–মানদেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার সরু সমুদ্রপথ। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
এই নৌপথে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে ঘুরতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিও যদি একই সময়ে অস্থিতিশীল থাকে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
এই কারণেই বাব আল–মানদেবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতিদের সক্ষমতা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা।
হুতিদের আসল শক্তি কোথায়
হুতিদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ভূখণ্ডভিত্তিক যুদ্ধক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের দক্ষতা এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামো।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বড় নৌযানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সমুদ্রপথে মাইন ব্যবহার কিংবা উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কাও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় উদ্বেগ।
তাদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো ভৌগোলিক অবস্থান। ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর জন্যও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানের ভূমিকা
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের সহায়তার বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ইরান হুতিদের অস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি হুতিদের হাতে পৌঁছানোর ফলে তাদের হামলার সক্ষমতা আরও বেড়েছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা। ফলে ইরানের জন্য হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত যত বাড়ে, ততই হুতিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লোহিত সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে চাপ সৃষ্টি করা তেহরানের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
এক বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধেও কেন জয় পেল না যুক্তরাষ্ট্র
২০২৫ সালের বসন্তে হুতিদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের লক্ষ্য ছিল হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা।
বিপুল অর্থ ব্যয় এবং আধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি ওয়াশিংটন। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। ভূগর্ভস্থ স্থাপনা, ছড়িয়ে থাকা সামরিক অবকাঠামো এবং দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের সক্ষমতা তাদের টিকে থাকতে সহায়তা করে।
আরেকটি সমস্যা ছিল—এটি কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়। এর সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সরাসরি যুক্ত।
ফলে বিমান হামলা চালিয়ে হুতিদের অস্ত্রভাণ্ডারের একটি অংশ ধ্বংস করা গেলেও তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি
মার্কিন অভিযান শুরুর প্রায় দুই মাস পর ৬ মে ট্রাম্প হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই সমঝোতায় হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করবে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ বন্ধ করবে—এমন সমঝোতা হয়।
ঘোষণাটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এতদিন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেই হুতিদের মোকাবিলার চেষ্টা করছিল। শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নিতে হয়।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। হুতিদের হামলা ইসরায়েলকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হুতিদের নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি এই সমঝোতাকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারলেও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতা
হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল সমস্যাটিকে অতিরিক্ত সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। লোহিত সাগরের সংকটের সঙ্গে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গাজা যুদ্ধের মতো একাধিক বিষয় জড়িয়ে রয়েছে।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও সমালোচনার মুখে পড়ে। সামরিক পরিকল্পনার কিছু তথ্য ভুলবশত সিগন্যাল অ্যাপে ফাঁস হওয়ার ঘটনাও এই বিতর্ককে আরও জোরালো করে।
সৌদি আরবের নতুন উদ্বেগ
হুতিদের অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। দেশটির পশ্চিম উপকূল ও লোহিত সাগরমুখী তেল পরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তা সরাসরি এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত।
সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন লোহিত সাগর উপকূলের তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনে সক্ষম এই অবকাঠামোতে হামলা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রিয়াদের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নতুন কোনো বড় সামরিক অভিযানে যেতে কতটা আগ্রহী, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সামনে কী
হুতিদের শক্তি এখন শুধু ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নেই। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আকাশ হামলা চালিয়ে হুতিদের সামরিক স্থাপনায় আঘাত করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু বিমান হামলা যথেষ্ট নয়। কারণ, হুতিদের পেছনে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক ভিত্তি, কঠিন ভৌগোলিক পরিবেশ এবং ইরানের সঙ্গে বিস্তৃত কৌশলগত সম্পর্ক।
তাই বিলিয়ন ডলারের সামরিক অভিযানও যেখানে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি, সেখানে হুতিদের মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—আরও বড় যুদ্ধ, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতা?
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেবের নিরাপত্তা যত বেশি জড়িয়ে পড়বে, ততই হুতিদের গুরুত্ব বাড়বে। আর সেই কারণেই তুলনামূলক ছোট একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও কৌশল বদলাতে বাধ্য করেছে—এ প্রশ্নটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, রয়টার্স, ওয়াই নেট গ্লোবাল ও মিডল ইস্ট মনিটর
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
Designed & Developed by: Security World





















