দেশের বাজারে আবারও বড় ধরনের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোল—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ছে।
নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা লিটারে বিক্রি হবে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এ বছরের মধ্যে এটি জ্বালানি তেলের দামে তৃতীয় দফার বড় সমন্বয়। এর আগে ১৮ এপ্রিল একবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। তখন ডিজেলের দাম ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা করা হয়েছিল।
এরপর জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুলাই ও আগস্টে দাম অপরিবর্তিত ছিল এবং সেপ্টেম্বরেও মাসের শুরুতে আগের দামই বহাল রাখা হয়েছিল। ফলে সেপ্টেম্বরের শেষভাগে এসে নতুন করে চার জ্বালানি পণ্যের দাম একসঙ্গে ২০ টাকা করে বাড়ানো হলো।
কেন আবার বাড়ল দাম
বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক-কর, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে দাম পর্যালোচনা করা হয়।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি সরবরাহপথ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ ডিজেলে
নতুন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ডিজেলের মাধ্যমে। দেশে পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, কৃষির সেচসহ বিভিন্ন খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক। জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর বলে এর দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, পণ্য পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব পড়ে।
এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির পরও এর প্রভাব পরিবহন খাতে দ্রুত দেখা গিয়েছিল। ঢাকায় রাইড-শেয়ারিংয়ের ভাড়াও বাড়ার খবর পাওয়া যায়। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে তখন পরিবহন, সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিতীয় দফায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল।
নিত্যপণ্যের দাম কি বাড়বে?
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম একই হারে বেড়ে যাবে—এমন সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে কৃষিতে সেচ, শিল্পে উৎপাদন এবং ব্যবসার লজিস্টিক ব্যয় বাড়তে পারে। এসব খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে আংশিকভাবে প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির পরও উচ্চ জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়কে মূল্যস্ফীতির অন্যতম চাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব বলছেন ব্যবসায়ীরা। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা জানিয়েছিলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তারা জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সরবরাহব্যবস্থার বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
মূল্যস্ফীতি কমার ধারায় নতুন চাপ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সময়টি অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। এরপর জুনে ৯ দশমিক ১৬, জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ এবং আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। আগস্টের ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি সেই ধারায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পরিবহন ও নন-ফুড খাতে এর প্রভাব আগে দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরবরাহ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে চূড়ান্ত প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
নতুন মূল্য কার্যকর হলে ব্যক্তিগত যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় সরাসরি বাড়বে। এর পাশাপাশি গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, কৃষির সেচ ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে একটি পণ্যের উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়ের প্রতিটি ধাপে বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ভাড়া কতটা সমন্বয় হয়, ব্যবসায়ীরা বাড়তি ব্যয় কতটা নিজেরা বহন করেন এবং সরকার বাজার তদারকি কতটা কার্যকরভাবে করতে পারে তার ওপর।
সামনে নজর তিন জায়গায়
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বাজার পরিস্থিতি বুঝতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—পরিবহন ভাড়া, কৃষি ও উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের খুচরা দাম। এসব খাতে দ্রুত অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এবং বাজারে অতিরিক্ত মুনাফা বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো গেলে প্রভাব সীমিত রাখা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, চলতি বছরের এপ্রিল ও জুনের সমন্বয়ের পর সেপ্টেম্বরের এই বড় মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে দেশের মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।