বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে এক নীরব অথচ যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করেছে গাজীপুর। পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ এই সময়ে পোশাক উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে যেখানে ‘টেকসই উন্নয়ন’ সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার, সেখানে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই শিল্পাঞ্চল।
যুক্তরাষ্ট্রের 'গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল' (USGBC) স্বীকৃত পরিবেশবান্ধব বা 'লিড' (LEED) সার্টিফাইড কারখানার সর্ববৃহৎ ক্লাস্টার গড়ে তুলে গাজীপুর এখন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বস্ততাকে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন উচ্চতায়।
গাজীপুরের শ্রীপুর, কোনাবাড়ী ও টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের সরেজমিন চিত্র বলছে—অন্ধকার, অপরিসর ও অতিরিক্ত উত্তপ্ত কাজের পরিবেশ এখন অতীত। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে আলো-বাতাসে পরিপূর্ণ আধুনিক ও সবুজ কারখানা।
গাজীপুরের এই সাফল্য এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক অর্জন নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর মডেল।
গাজীপুরের পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলোর মূল শক্তির জায়গা হলো সম্পদের সঠিক ব্যবহার। বিশাল আকৃতির সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি নির্ভরতা কমানো হয়েছে, যা কার্বন নির্গমন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়।
রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা চালু করে ওয়াশিং ও ডাইংয়ের কাজে তা পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। আধুনিক ETP এবং STP প্ল্যান্টের মাধ্যমে শতভাগ পানি রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে বর্তমানে লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা ২৯১টি (যার মধ্যে ১১১টি ‘প্লাটিনাম’ এবং ১৩৩টি ‘গোল্ড’)। এর মধ্যে বিশ্বসেরা তালিকায় গাজীপুরের অবস্থান শীর্ষবিন্দুতে। এসএম সোর্সিং, তানিশা ফেব্রিকস, ইস্প্রিট অ্যাপারেলস, নিট এশিয়া, ইন্ট্রিগ্রা ড্রেসেস, লিডা টেক্সটাইল এবং লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজের মতো শীর্ষ গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো গাজীপুরেই অবস্থিত।
৩৬০ ডিগ্রি টোটাল সলিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনন্ত আহমেদ বলেছেন, অতীতে রানা প্লাজা বা তাজরীনের ঘটনায় বাংলাদেশের যে নেতিবাচক চিত্র তৈরি হয়েছিল, আজ বিশ্বসেরা ১০টি গ্রিন প্রজেক্টের বেশিরভাগ বাংলাদেশে থাকায় সেই কালিমা দূর হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন লিড সার্টিফাইড কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বুকিং করে নিচ্ছেন।
বিজিএমইএ পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বললেন, আগামী দিনে টেকসই উৎপাদন কেবল নীতি মানা নয়, বরং বিশ্ববাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত। গাজীপুরকে মডেল 'গ্রিন গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার, বিজিএমইএ ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে।
মাসকো গ্রুপের জিএম ইঞ্জিনিয়ার মো. ইকবাল হোসেন খান বরলেন, নির্মল বাতাস, বিদ্যুৎ-পানি সাশ্রয় ও ৩০% উন্মুক্ত সবুজ এলাকার মাধ্যমে চমৎকার কাজের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বায়াররা সরাসরি বাড়তি দাম না দিলেও এটি পরিচালন খরচ কমায় ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়।
পরিবেশপ্রকৌশলীদের মতে, পরিবেশবান্ধব কারখানায় রূপান্তরের বড় বাধা হলো প্রাথমিক উচ্চ বিনিয়োগ। এই সবুজ গতি বজায় রাখতে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি গ্রিন ফাইন্যান্সিং, স্বল্প সুদে ঋণ, ট্যাক্স রেয়াত এবং নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি (SME) কারখানাগুলোকে এই ধারায় আনতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের গ্রান্ট বা অনুদানের সুব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।